উত্তাল সমুদ্রে ভয়ানক ৩ ঘন্টা
উত্তাল সমুদ্রে ভয়ানক ৩ ঘন্টা-
সময়টা ছিল সম্ভবত ২০১৪ এর মাঝামাঝি জুন কিংবা জুলাই,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এ বন্ধু মোজাফফর এখানে গিয়েছি।
রাত ১২ টায় হঠাৎ করে মাথায় ভূত চাপলো সেন্টমার্টিন যেতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ,পরদিন বন্ধু শামীমকে নিয়ে বহদ্দারহাট থেকে হানিফ পরিবহনে রওনা দিলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
উপকূলীয় অঞ্চলে তখন সংকেত চলছিল যা আমাদের মাথায় ছিল না।
বাসে উঠার পর সম্ভবত ডি ৩ ও ৪ সিটে আমি জানালার পাশে বসলাম, আমাদের বিপরীত সিটে একজন ভদ্রমহিলা তার সন্তান ও সম্ভবত বোনকে নিয়ে বসলেন।
বাচ্চাটা এত কিউট ছিল যে বাসের প্রায় সকল যাত্রীই কোলে নিতে চাইলো,বাচ্চাটা কারো কাছে যায় নি।
মনে মনে ইতস্তত করলাম বাচ্চাটাকে কোলে নেয়ার চেস্টা করবো না কিন্তু এত সুন্দর বাচ্চা নিজেকে সংবরণ করতেও পারলাম না।
শামীম ট্রাই করলো লাভ হয় নি,মিনিট দুয়েক পর আমি হাত বাড়ালাম, বাচ্চাটা সরাসরি চলে আসলো আমার কোলে।
মিনিট পাঁচেক পর বাচ্চাটার মা বাচ্চাটিকে খাওয়ানোর জন্য কাছে নিতে চাইলেন, কোনভাবেই বাচ্চাটি যাবে না।।
চট্টগ্রাম নতুন ব্রীজ থেকে শুরু সাতকানিয়া গিয়ে বাচ্চাটি সহ বাস থেকে নেমে চিপস,বিস্কিট আর জুস কিনে বাসে বসেই খাওয়ালাম।
তারা লোহাগড়া নামবেন,লোহাগড়া আসার ২ মিনিট পূর্বে
ভদ্রমহিলা ব্যাগ রেডি করছেন।
লোহাগড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ২০০ গজ আগেই নামবেন,বাস থামলো কিন্তু বাচ্চাটিকে কোনভাবেই নেয়া যাচ্ছে না।
আমি বাচ্চাটিকে নামিয়ে দিতে সিট থেকে উঠলাম,সামনে তার মা ও সম্ভবত তার আন্টিকে দেখে কেঁদে উঠলো,সে কোনক্রমেই যাবে না।।
প্রায় ২ মিনিট চেষ্টার পর ড্রাইভার সাহেব আসলেন,বললেন বাচ্চার মা ও আন্টি তাদের গন্তব্য স্থলে নেমে যেতে আর আমাকে বললেন বাসস্ট্যান্ডে বিরতি দিবে ২০ মিনিট,আপনি নেমে তখন দিয়ে আসবেন।
বুদ্ধি কাজে দিল,তারা নেমে যাওয়ার পর বাচ্চাটি আশ্বস্ত হল। বাসস্ট্যান্ডে নেমে আমি বললাম চলো নিচ থেকে চিপস নিয়ে আসি।
নেমেই ২০০ গজ উত্তরে অপেক্ষমাণ তার মায়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম,কাছাকাছি আসার পরেই তাদের দেখে কান্নাকাটি শুরু করে দিল।
অনেক চেস্টার পর কান্নারত অবস্থাতেই জোড় করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে আসলাম।
প্রচন্ড খারাপ লাগছিল, বড় একটি ভূল ছিল তাদের এড্রেস কিংবা ফোন নং সংগ্রহ করতে মনে ছিল না,গতরাতে স্বপ্নে দেখলাম।
এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার স্বপ্নে বাচ্চাটিকে দেখেছি,অন্নপূর্ণা নাম বাচ্চাটির,বয়স ৩ কি সাড়ে তিন হবে।বাচ্চার সবাই সুন্দর কিন্তু এত সুন্দর বেবি আমি আর দেখিনি সম্ভবত।।
যাইহোক ১ টার দিকে রিং রোড (লিংক রোড) এ নামলাম, সি কক্সে টেকনাফের দিকে রওনা দিলাম।দমদমিয়া আসার আগেই শুনলাম শিপ বন্ধ।
টেকনাফ ট্রলার ঘাটে গেলাম,কোন ট্রলার যাবে না,তখনও মনে হয় নি সংকেত চলছে।
রাতে টেকনাফে থেকে গেলাম হোটেল দ্বীপ প্লাজায়, সকাল ৯ টায় আবার ঘাটে গেলাম কোন ট্রলার ই যাবে না।
নাছোড়বান্দা স্বভাবের জন্যই শাহ পরির দ্বীপে রওনা হলাম,বৃষ্টি নেই,বাতাস নেই যা দেখে বুঝার উপায় আছে সংকেত চলছে।।
১১ টায় শাহ পরির দ্বীপে জেটিঘাটে সিএনজি থেকে নেমেই ট্রলারের শব্দ পেলাম।
দৌড়ে জেটিতে গেলাম ট্রলার, সদ্য নোঙ্গর ছেড়েছে,জোর আওয়াজে ট্রলার চালককে বুঝানোর চেস্টা করলাম, সফল হলাম।
ট্রলারে আমরা দুজন সহ ৬ জন তাবলীগ জামাত থেকে যাওয়া ১৩/১৪ বছর বয়সী কিশোর ২ জন কিশোরী ট্রলার চালকের মেয়ে, ট্রলার চালক ও সহযোগী ২ জন আর চারটি বড় গরু।।
আমি এসে বসলাম ট্রলারের সামনের উচু অংশটাতে,শামীমও আসলো।তার প্রথম ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি বিধায় বারবার না করলাম,তাও আসলো।।
সমুদ্রে ঢেউ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে সাথে বাতাসের তীব্রতা।
ট্রলারের সামনের অংশ প্রচন্ড ভাবে দুলছে,অনেকে উচুতে উঠছে ও প্রচন্ড গতিতে পানির গভীরে যাচ্ছে।
উপায় না দেখে নোঙ্গরের শক্ত রশিতে নিজেদের পেচিয়ে নিলাম।
কোনভাবেই সাহস করতে পারলাম না ট্রলারের সমান্তরাল স্থানে আসার,কারণ সাইড দিয়ে আসতে হবে,ঝাঁকিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।
আত্মা বের হওয়ার উপক্রম যদিও সেন্টমার্টিন ট্রলার ভ্রমনে এটা ১৭ তম ভ্রমণ ছিল।
মাঝামাঝি সমুদ্রে প্রচন্ড বাতাস ও বৃষ্টি শুরু হল।ট্রলার প্রবল লাফালাফি শুরু করলো,মাঝি চিল্লাতে শুরু করলো।সবাই আল্লাহ খোদার নাম উচ্চারণ শুরু করলো।
এদিকে নোঙ্গরের রশিতে হাত কখন কেটেছে মনে নেই,প্রচন্ড বেগে ছিটকে আসা সমুদ্রের লবনাক্ত পানি হাতে প্রকট যন্ত্রণার উৎস তৈরী করলো।।
ছুড়ি মাছ লাফিয়ে ট্রলারে এসে পড়ছে,সবাই একরকম বিপর্যস্ত।।ঢেই তীব্র থেকে তীব্র তর হল,মনে হচ্ছিল সামনের এত উচু অংশটা এখনি আমাদের নিয়ে ডুবে যাবে।তীব্র পানিতে গোছল হয়ে গিয়েছে আমাদের।।
মাঝি সহ সহকারী ২ জন প্রচন্ড শক্তি দিয়ে হাল ধরে রেখেছে।
গরু গুলো একবার একপাশে ধাক্কা খাচ্ছে আরেকবার প্রচন্ড বেগে অন্যদিকে।।
তখন মনে হয় জীবনে এতবার সৃষ্টিকর্তা কে পুরো জীবনেও স্মরণ করি নি।
এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় ১ ঘন্টা পর সেন্টমার্টিনের কাছে এসে পৌছলাম, আর ৫/১০ মিনিট লাগবে জেটিতে পৌঁছাতে তারপরও মনে হচ্ছিল এই বুঝি ডুবে যাচ্ছে ট্রলার।।
ঢেউয়ের তীব্রতার জন্য জেটিতে ট্রলার ভিরানো সম্ভব হয় নি,দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে তীর থেকে প্রায় ১৫ ফুট দূরত্বে নোঙ্গর করার চেষ্টা করে কিন্তু কোনভাবেই নোঙ্গর করা সম্ভব হচ্ছিল না।তীর থেকে ১০/১২ জন নোঙ্গরের রশি ধরে রেখেছে,আমি ট্রলার থেকে লাফ দিয়ে পানিতে নেমে সাঁতরে তীরে আসলাম।
শামীম কে স্থানীয় দের সহায়তায় নামালাম।
এত ভয়ংকর ভ্রমণ এখন পর্যন্ত একটাই।
যাইহোক সেন্টমার্টিনে পর্যটক আমরা দুজন,সকল খাবারের হোটেল বন্ধ।কাপড়চোপড় সবগুলো ভিজে একাকার।
গামছা কিনলাম,দুপুরে খাবার হিসেবে স্থানীয় দোকানে ভাজা পুরি সিঙ্গারা দিয়ে চালিয়ে নিলাম।
উঠলাম জলপরি রিসোর্টে, মালিক ঢাকার,পরিচিত হওয়ায় ম্যানেজার সকল ব্যবস্থা করলেন।
রিসোর্টে আমি শামীম ও ম্যানেজার।
রাতে স্থানীয় বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা করলেন ম্যানেজার।
নিস্তব্ধ নির্জন দ্বীপ,প্রবলভাবে বাতাস ও বৃষ্টি হচ্ছে, সন্ধার সময়কেও গভীর রাত মনে হচ্ছে।
৮/৯ টার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভেঙে ঘড়িতে দেখি রাত ২.০০ টা,হোটেলের দরজা খোলা,শামীম রুমে নেই।
অজানা এক ভয় মনে ভর করলো,বারান্দায় টর্চের লাইটে শামীমকে খুঁজলাম, সে কোথাও নেই।।
ভূত এফএম এর সেন্টমার্টিনের ভৌতিক গল্পগুলো মনে আসা শুরু করলো।
একহাতে ম্যাচ ও অন্যহাতে টর্চ দিয়ে যতদূর লাইটের আলো যায় খুঁজছি, শামীম কোথায় নেই।।
বারান্দায় বসে আছি,মাথায় নানান চিন্তার ঝড় বইছে,ভীত হয়ে পড়েছি,এখন কি হবে!!
যাইহোক প্রায় আধাঘন্টা পর এক স্থানীয় ব্যক্তি ছাতা নিয়ে শামীমসহ রিসোর্টে আসলেন।
বৃষ্টির মাঝে সাহসী মানুষ বিচে গিয়েছিলেন গভীর রাতে।।
শামীর আসার পরেও মনে আশঙ্কা ছিল,সপ্তপর্ণে টর্চ লাইটের আলোয় শামীমের পায়ের পাতা দেখলাম শামীম কে বুঝতে না দিয়ে।
ভোরে ম্যানেজার সাহেব ছাতা দিলেন,বাতাস কমেছে কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে,শামীম আর আমি বিচের দিকে গেলাম।
স্থানীয়রা জাল দিয়ে মাছ ধরছে দ্বীপ থেকে সমুদ্রের দিকে স্রোতের ধারাতে।
নির্জন সমুদ্র এত সুন্দর হয়, গতকালের বিভীষিকা ময় ঘটনা গুলো নিমিষেই ভুলে গেলাম।
সমুদ্র ভয়ানক উত্তাল ভয়ানক সুন্দর যা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।।
স্থানীয় জেলেদের কাছে শুনলাম সংকেত নং-৫।
পরদিন সূর্যের আলো দেখা মিললো, দ্রুত রওনা হলাম জেটির দিকে যদি কোন ট্রলার টেকনাফের দিকে যায় সে উদ্দেশ্যে।
স্থানীয় দের নিয়ে একটি ট্রলার টেকনাফ আসবে,আমরা উঠে বসলাম মনে সাহস নিয়ে।
লাইফ জ্যাকেট পড়ে নিলাম,সমুদ্র উত্তাল।আল্লাহর নাম নিয়ে কোন রকম বিপত্তি ছাড়াই টেকনাফ পৌছলাম।।
সকল প্রশংসাই মহান প্রতিপালকের প্রতি।।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ নিয়ে আরো দুইটি ঘটনা আরেকবার শেয়ার করবো,একবারতো সমুদ্রের ভয়াবহ সৌন্দর্য উপভোগ করতে টানা ২৭ দিন শাহপরির দ্বীপে থেকে গিয়েছিলাম।।
পরবর্তী কোন ভ্রমণে সহযাত্রী হতে চাইলে কমেন্টে সাহসী পদক্ষেপ জানিয়ে রাখুন।।
ছবিটি ২০১৭ সালে,সিটি ল্যাব টিম নিয়ে ভ্রমনের সময় বিজিবি বিচে রায়হানের হাতে তোলা।।
এ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ সংখ্যা ৫৩.....
বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ ই-ট্যুরিজমের সাথে সেঞ্চুরি পূর্ণ করবো ২০২৭ সালের মাঝে।।
ভ্রমণ জ্ঞানের চোখ খুলে,অভিজ্ঞতা বাড়ায়,কর্ম উদ্দীপনা বাড়ায়।
সকলের ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও আনন্দের।।








